
হাসমত, স্টাফ রিপোর্টার
প্রশাসনের নীরবতায় উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস, হুমকির মুখে খাদ্যনিরাপত্তা
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে রাতের আঁধারে উর্বর ধানি জমি খনন করে একের পর এক পুকুর তৈরি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের পক্ষ থেকে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলছে এই পুকুর খনন কার্যক্রম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ‘ম্যানেজ’ করেই শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে পুকুর খনন করা হচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন ট্রাক্টর দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে, ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি, অন্যদিকে ধ্বংস হচ্ছে জনসাধারণের যোগাযোগ ব্যবস্থাও।
শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের রাতোয়াল, মঙ্গলপাড়া সহ একাধিক গ্রামে অন্তত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পুকুর খনন চলছে বলে জানান স্থানীয়রা। কোথাও কোথাও দিনের বেলাতেও প্রকাশ্যেই মাটি কাটার কাজ চলতে দেখা গেছে।
রাতোয়াল গ্রামের এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“যারা পুকুর খনন করছে তারা বিএনপির লোক। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পুলিশ এখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পায়, তাই দিনেও-রাতেও তারা মাটি কাটলেও কেউ কিছু বলে না। আগে এই জমিতে আমরা ধান চাষ করতাম, এখন জমির আশপাশেও যাওয়া যায় না। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
মঙ্গলপাড়া গ্রামের আরেক কৃষক জানান,
“একসময় দুই পাশের বিলজুড়ে শুধু সবুজ ধানের মাঠ দেখা যেত। এখন যতদূর চোখ যায় শুধু পুকুর আর পুকুর। আগের ইউএনও টাকা খেয়ে পুকুর করতে দিয়েছে, এখন যিনি আছেন তিনিও আলাদা নন। এসব নিয়ে কথা বললেই আমাদেরই খারাপ বানানো হবে।”
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাণিজ্যিক মাছের পুকুর ও পুকুর খননের জন্য মাটি বিক্রির কারণে রাজশাহী জেলায় দ্রুত হারে কমে যাচ্ছে উর্বর আবাদি জমি। এতে খাদ্যনিরাপত্তা, মাটির উর্বরতা এবং ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় মোট আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ জলাশয় বেড়েছে ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর থেকে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে। পাশাপাশি বসতবাড়ি, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ নির্মিত এলাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭২৭ হেক্টর।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহীর বহু উচ্চ ফলনশীল কৃষিজমি কৃষিজমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন, ২০১৮ এবং মৃত্তিকা সংরক্ষণ নীতিমালা লঙ্ঘন করে বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তর করা হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ২৭৫টিতে—প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে কৃষক ও এনজিও কর্মকর্তাদের দাবি, নিবন্ধনহীন ও অবৈধ পুকুরের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কৃষিজমিতে পুকুর খননের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের যাচাই শেষে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া প্রায়ই উপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রশাসনের নজর এড়াতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাতের আঁধারে পুকুর খনন করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব সিন্ডিকেট আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এতে জড়িত।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার জানান,
“অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী রাতের অভিযানও চালানো হচ্ছে।”