
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি :
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার ছোট্ট জনপদ ‘অন্ধের টেক’। আয়তনে ছোট হলেও দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা আর টিকে থাকার সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে এই জনপদের। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুতের আলো থেকে বঞ্চিত থাকা এই জনপদের ৪৭টি পরিবারের ঘরে অবশেষে জ্বলে উঠেছে বিদ্যুতের আলো। এতে দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে বাসিন্দাদের।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় পরিত্যক্ত সরকারি জমিতে ৪৫টি ভূমিহীন পরিবারকে অস্থায়ীভাবে বসবাসের মৌখিক সম্মতি দেন। ওই পরিবারগুলোর মধ্যে ২৭টি পরিবারের প্রধান জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাকি পরিবারগুলো তাঁদের সন্তান ও স্বজনদের নিয়ে বসবাস করছে। বসতির অধিকাংশ মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় একসময় এলাকাটির নাম হয়ে যায় ‘অন্ধের টেক’।
সময়ের সঙ্গে কালিয়াকৈরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেলেও অন্ধের টেক থেকে যায় বিদ্যুৎবিহীন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের পাশাপাশি তাঁদের সন্তান ও স্বজনদেরও দীর্ঘদিন অন্ধকারে বসবাস করতে হয়েছে। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা ডুবে থাকত অন্ধকারে। এতে পড়াশোনা, দৈনন্দিন কাজসহ নানা ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো বাসিন্দাদের।
বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতি কোরবান আলী এর আগে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘সবাই কয় ঘরে ঘরে আলো জ্বলব, কিন্তু আমাগো ঘরে তো আলো জ্বলেনি! আমরা তো চোখেই দেখি না, তাই হয়তো সবাই অবহেলা করে। আমাগো বউ-পোলাপাইনও এই অন্ধকারে দিনে দিনে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরেছেন অন্ধের টেকের বাসিন্দারা। জমির স্থায়ী মালিকানা না থাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। একপর্যায়ে বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার এলাকায় আনা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধার কারণে সেগুলো আবার সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি প্রয়াত সাহাজ উদ্দিনের স্ত্রী আজিরন বেগম বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় বিদ্যুতের জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে শুধু আশ্বাসই মিলেছে, কিন্তু বিদ্যুৎ আর আসেনি। মৃত্যুর আগে তাঁর স্বামী হয়তো ভেবেছিলেন, এই ঘরে আর বিদ্যুতের আলো জ্বলবে না। তবে তাঁর মৃত্যুর পর হলেও সেই দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
সম্প্রতি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে অন্ধের টেকের বাসিন্দারা তাঁদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। এরপর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জটিলতা নিরসনে কাজ শুরু হয়।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঞার উদ্যোগে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় করে সংযোগ দেওয়ার কাজ এগিয়ে নেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ আগস্ট বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি প্রয়াত সাহাজ উদ্দিনের ছেলে ফারুক হোসেনের ঘরে প্রথম বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ দেওয়া হয়। পরে গত ২৯ আগস্ট অন্ধের টেকের মোট ৪৭টি ঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান সম্পন্ন হয়।
শুধু বিদ্যুৎ সংযোগেই থেমে থাকেনি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ। বাসিন্দাদের বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট দূর করতে একটি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঞা বলেন, গাজীপুরে যোগদানের পর জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষদের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় বসবাসের বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রশাসন কাজ করছে। অন্ধের টেকের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। এর ফলেই দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিদ্যুতের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত এসব মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিশুদ্ধ পানির জন্য সাবমার্সিবল পাম্প এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার পর অন্ধের টেকজুড়ে এখন আনন্দের আবহ। ঘরে ঘরে জ্বলছে বাতি, ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। দীর্ঘদিনের অন্ধকারের পর নতুন আলোয় সন্তানদের মুখে হাসি দেখে উচ্ছ্বসিত পরিবারের সদস্যরা।
বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতি কোরবান আলী বলেন, ২৪ বছর ধরে তাঁরা বিদ্যুতের অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে ঘরে বিজলির আলো জ্বলেছে। তাঁদের চোখের অন্ধকার হয়তো দূর হবে না, তবে ঘরের আলো তাঁদের সন্তানদের জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলবে।
অন্ধের টেকে বিদ্যুতের সংযোগ তাই শুধু কয়েকটি ঘরে আলো জ্বালানোর ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দুই যুগের অপেক্ষার পর অন্ধের টেকের ঘরে জ্বলে ওঠা এই আলো যেন নতুন স্বপ্ন ও নতুন দিনের বার্তা হয়ে এসেছে।