
স্টাফ রিপোর্টার আনোয়ার হোসেন
রাজধানীর উপকণ্ঠে পরিকল্পিত আধুনিক উপশহর পূর্বাচল এখন ভূমিদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর শত কোটি টাকার সরকারি জমি দখল করে চলছে রমরমা দোকান বাণিজ্য। রূপগঞ্জের ১০ নম্বর সেক্টরের লেংটার মাজার এলাকায় রাজউকের কোনো বরাদ্দ বা অনুমতি ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল অবৈধ মার্কেট। আর এই অনিয়মের খবর সংগ্রহ করার সময় সাংবাদিককে অশালীন ভাষায় হুমকী প্রদান করে ভূমিদস্যুরা।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০ ও ১১ নম্বর সেক্টরের মাঝামাঝি লেংটার মাজার সংলগ্ন এলাকায় রাজউকের সাইনবোর্ড উপড়ে ফেলে রাতের আঁধারে টিনের বেড়া দিয়ে দখলদারিত্ব শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে ১০০-এর বেশি অবৈধ দোকান ঘর তোলা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রটি একেকটি দোকান থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা করে অগ্রিম জামানত হাতিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারি জমিতে পসরা সাজিয়ে বসা এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে মাসিক মোটা অংকের ভাড়া।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজউকের সীমানা ও সাইনবোর্ড তোয়াক্কা না করেই বিশাল এলাকা জুড়ে অবৈধ এই মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি জমি এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে দখল করে ব্যবসা চালানো হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ীরা জানান, প্রভাবশালী একটি চক্রের ইশারায় এই দখলদারিত্ব চলছে। মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে এখানে কেউ বসার সুযোগ পায় না। প্রশাসনের নাকের ডগায় সরকারি সম্পদ এভাবে লুটপাট হলেও দেখার কেউ নেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দখলদার চক্রটি রাজউকের জমিকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে সহজ-সরল ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলছে। বড় অঙ্কের জামানত ও মাসিক মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে তারা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। এর ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি পূর্বাচলের পরিকল্পিত নগরায়ণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, রাজউকের অনুমতি ছাড়াই এই মার্কেট তৈরি করছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাসেল, মোহন, সালাউদ্দিন সহ তাদের অনুসারীরা। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি স্থানীয়দের। তবে রাসেল ৫ই আগস্টের আগে যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। বর্তমানে বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে রাজউকের এই জায়গা দখল করেছে। বিএনপির অফিস ও মার্কেট তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অপেক্ষা করে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে প্রশাসন। যে কারণে নীরব ভূমিকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দখলযজ্ঞের মূল হোতা স্থানীয় প্রভাবশালী রাসেল, মোহন ও সালাউদ্দিন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোল পাল্টাতে পটু এই রাসেল। ৫ই আগস্টের আগে যুবলীগের দাপট দেখালেও বর্তমানে তিনি বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এমনকি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা উপেক্ষা করে দলের নাম ব্যবহার করে সাইনবোর্ড টানিয়ে এই অবৈধ মার্কেট পরিচালনা করছেন তিনি। সরকারি জমি দখল করে ব্যক্তিগত পকেট ভারী করলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা সাধারণ মানুষকে হতবাক করেছে। পূর্বাচলের পরিকল্পিত নগরায়ণ রক্ষায় এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ পুনরুদ্ধারে এই দখলবাজ সিন্ডিকেট এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
অভিযুক্ত রাসেলের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো রাখঢাক না করেই অবৈধ দখলের কথা স্বীকার করেন। তবে রাজউকের অনুমতি আছে কি না জানতে চাইতেই তিনি রণমূর্তি ধারণ করেন। একজন সংবাদকর্মীকে উদ্দেশ্য করে তিনি অত্যন্ত নিচ ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। দম্ভোক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, পারলে কিছু করে দেখান, সরাসরি এসে দেখা করেন। দেখি কে কী করতে পারে। সরকারি জমি দখল করে এমন প্রকাশ্য আস্ফালন এবং গণমাধ্যমকর্মীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজউকের উপ-পরিচালক ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. লিটন সরকার জানান, সরকারি জমি দখলের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।